বৃহস্পতিবার ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ - ০৮:৪৭
জাহেলি যুগে কন্যাশিশুকে জীবন্ত কবর দেওয়ার প্রথা কখন ও কেন শুরু হয়েছিল?

‘ওয়াদ’—অর্থাৎ কন্যাশিশুকে জীবন্ত কবর দেওয়া—ইসলামপূর্ব আরবের ইতিহাসে উল্লেখিত অন্যতম নৃশংস প্রথা। তবে এ প্রথার উৎপত্তি, ব্যাপকতা ও কারণ সম্পর্কে ঐতিহাসিক সূত্রে বিভিন্ন বর্ণনা ও মতামত রয়েছে। তাই এর ইতিহাস নির্ধারণে সতর্কতা অবলম্বন জরুরি।

হাওজা নিউজ এজেন্সি: কন্যাশিশুকে জীবন্ত কবর দেওয়ার প্রথা কীভাবে শুরু হয়েছিল—এ প্রসঙ্গে কিছু ঐতিহাসিক গ্রন্থে হিরার রাজা নোমান ইবনে মুনযির ও বনু তামীম গোত্রের একটি ঘটনা বর্ণিত হয়েছে।

বর্ণনা অনুযায়ী, বনু তামীম নোমান নির্ধারিত কর দিতে অস্বীকৃতি জানালে তিনি তাদের বিরুদ্ধে একটি বাহিনী পাঠান। এ অভিযানে বনু তামীমের বেশ কিছু নারী ও কন্যা বন্দি হন।

পরবর্তীতে পরিস্থিতির পরিবর্তন হলে উভয় পক্ষের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। বনু তামীমের নেতারা বন্দিদের ফিরিয়ে নিতে নোমানের কাছে গেলে তিনি বন্দিদের নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেন। তারা চাইলে নিজেদের পরিবার ও গোত্রের কাছে ফিরে যেতে পারত; আবার যাদের সঙ্গে তাদের বিবাহ হয়েছিল, তাদের সঙ্গে থাকতেও পারত।

বন্দিদের মধ্যে কায়েস ইবনে আসিমের এক কন্যা তার স্বামীর সঙ্গে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ঘটনাটি কায়েসের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক ছিল। বর্ণনা অনুযায়ী, এরপর তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে তার কন্যাসন্তান জন্মালে তিনি তাকে জীবিত রাখবেন না। পরবর্তীতে তিনি কয়েকজন কন্যাকে জীবন্ত কবর দিয়েছিলেন বলে ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে।

কিছু সূত্রে এই ঘটনাকে আরবের কোনো কোনো গোত্রে ‘ওয়াদ’ প্রথার বিস্তার বা প্রচলনের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই ঘটনাকেই কন্যাশিশু হত্যার প্রথার নিশ্চিত সূচনাবিন্দু বলা যায় না। কারণ, এ বিষয়ে ঐতিহাসিক সূত্রে ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনা রয়েছে এবং এ প্রথা ঠিক কখন শুরু হয়েছিল, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায় না।

তবে এটুকু বলা যায় যে, ইসলামপূর্ব আরব সমাজের কিছু অংশে কন্যাশিশুকে জীবন্ত কবর দেওয়ার ঘটনা ঘটত এবং পবিত্র কোরআন এ নৃশংসতার কঠোর নিন্দা করেছে।

সব আরব গোত্রে কি এ প্রথা প্রচলিত ছিল?
কিছু গবেষকের মতে, ‘ওয়াদ’ সব আরব গোত্রের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল না। কারণ, এটি যদি সর্বত্র প্রচলিত একটি সাধারণ প্রথা হতো, তাহলে এর উল্লেখযোগ্য জনমিতিক প্রভাব এবং জাহেলি যুগের কবিতায় আরও ব্যাপক প্রতিফলন দেখা যেত।

এ ছাড়া, সংরক্ষিত জাহেলি কবিতায় কন্যাশিশু হত্যাকে সাধারণভাবে গৌরবের বিষয় হিসেবে তুলে ধরা কিংবা যারা তা করত না, তাদের নিন্দা করার সুস্পষ্ট প্রমাণও পাওয়া যায় না।

তবে ঐতিহাসিক বর্ণনায় কিছু গোত্রে এ ধরনের নৃশংসতার ঘটনা ঘটার প্রমাণ রয়েছে। যেমন, সাসাআহ ইবনে নাজিয়াহ—যিনি কবি ফারাজদাকের পূর্বপুরুষ হিসেবে পরিচিত—সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে যে, জাহেলি যুগে তিনি এমন এক কন্যাশিশুকে উদ্ধার করেছিলেন, যার বাবা তাকে জীবন্ত কবর দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। পরবর্তীতে তিনি প্রায় ২৮০ জন কন্যাশিশুকে এভাবে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেন বলেও বর্ণনা রয়েছে।

সুতরাং, ‘ওয়াদ’ একটি ঐতিহাসিক বাস্তবতা হলেও, একে জাহেলি যুগের সব আরবের সর্বজনীন ও অভিন্ন প্রথা হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।

শুধু আরবদের মধ্যেই কি সন্তান হত্যার ঘটনা ঘটত?
ইতিহাসবিদ ড. জাওয়াদ আলী, Encyclopaedia Britannica-এর বরাত দিয়ে উল্লেখ করেছেন যে, সন্তান হত্যা ও কন্যাশিশুকে জীবন্ত কবর দেওয়ার ঘটনা শুধু আরবদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বিভিন্ন জাতি ও সমাজেও নানা কারণে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। মিসর, গ্রিস, রোম এবং অস্ট্রেলিয়ার কিছু আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যেও এর নজির পাওয়া যায়।

সূত্র: জাওয়াদ আলী, আল-মুফাসসাল ফি তারিখিল আরব কাবলাল ইসলাম, খণ্ড ৫, পৃ. ৯১–৯২।

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha